অধ্যায়–৯ বাংলাদেশের জলবায়ু | বাংলাদেশ তথ্যকোষ (Bangladesh Encyclopedia)
অধ্যায়–৯
বাংলাদেশের জলবায়ু | বাংলাদেশ তথ্যকোষ (Bangladesh Encyclopedia)
ভূমিকা
বাংলাদেশের জলবায়ু প্রধানত উষ্ণ, আর্দ্র ও মৌসুমি প্রকৃতির। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের নৈকট্য, নদ-নদীর বিস্তৃতি এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের জলবায়ু গঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত ছয়টি ঋতু দেখা গেলেও আধুনিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুগুলোর বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের কৃষি, অর্থনীতি, মানুষের জীবনযাত্রা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ জলবায়ুর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য—
উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ
মৌসুমি বায়ুর প্রভাব
প্রচুর বৃষ্টিপাত
গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রা
শীতকালে তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া
উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব
বাংলাদেশের ঋতু
বাংলা সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে ছয় ঋতুর দেশ বলা হয়।
ছয়টি ঋতু হলো—
১. গ্রীষ্ম
২. বর্ষা
৩. শরৎ
৪. হেমন্ত
৫. শীত
৬. বসন্ত
তবে জলবায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে প্রধানত তিনটি ঋতু বেশি স্পষ্ট—
গ্রীষ্মকাল
বর্ষাকাল
শীতকাল
১. গ্রীষ্মকাল
সময়কাল:
মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য—
তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
আবহাওয়া গরম ও শুষ্ক থাকে।
কালবৈশাখী ঝড় দেখা যায়।
বজ্রপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
গ্রীষ্মকালে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে।
২. বর্ষাকাল
সময়কাল:
জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত।
বর্ষাকাল বাংলাদেশের জলবায়ুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বৈশিষ্ট্য—
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
নদী ও জলাশয়ে পানি বৃদ্ধি পায়।
কৃষিকাজের জন্য পানি সরবরাহ হয়।
অনেক অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি বিশেষ করে ধান চাষ বর্ষার পানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
৩. শীতকাল
সময়কাল:
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য—
আবহাওয়া শুষ্ক ও ঠান্ডা থাকে।
আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়।
বিভিন্ন শীতকালীন ফসল উৎপন্ন হয়।
তাপমাত্রা
বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা সাধারণত—
গ্রীষ্মকালে: প্রায় ২৫°–৩৫° সেলসিয়াস
শীতকালে: প্রায় ১০°–২৫° সেলসিয়াস
তবে অঞ্চলভেদে তাপমাত্রার পার্থক্য দেখা যায়।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গ্রীষ্মে বেশি গরম এবং শীতে বেশি ঠান্ডা অনুভূত হয়।
বৃষ্টিপাত
বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অঞ্চলভেদে ভিন্ন।
বেশি বৃষ্টিপাত হয়—
সিলেট অঞ্চল
চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল
কম বৃষ্টিপাত হয়—
রাজশাহী ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায়
বৃষ্টিপাত দেশের কৃষি ও পানিসম্পদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মৌসুমি বায়ু
বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান নিয়ামক হলো মৌসুমি বায়ু।
বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্র বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাব—
কৃষিতে সহায়তা করে।
নদ-নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করে।
পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রধান দুর্যোগ—
ঘূর্ণিঝড়
জলোচ্ছ্বাস
বন্যা
নদীভাঙন
খরা
অতিবৃষ্টি
বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বেশি দেখা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বর্তমানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
প্রধান প্রভাব—
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
উপকূলীয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি
অনিয়মিত বৃষ্টিপাত
তাপমাত্রা বৃদ্ধি
কৃষিতে পরিবর্তন
জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব
বাংলাদেশের জলবায়ুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব
জলবায়ু দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে—
কৃষি
ধান, পাট, গম, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল।
মৎস্য
নদী, হাওর, বিল ও সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
পর্যটন
ঋতুভিত্তিক আবহাওয়া পর্যটন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তথ্যছক
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জলবায়ুর ধরন | উষ্ণ ও মৌসুমি |
| প্রধান নিয়ামক | মৌসুমি বায়ু |
| প্রধান ঋতু | গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত |
| বেশি বৃষ্টিপাত | সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল |
| বেশি গরম | উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল |
| প্রধান দুর্যোগ | ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস |
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের জলবায়ু দেশের প্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মৌসুমি বায়ু, নদী ও বঙ্গোপসাগরের প্রভাব বাংলাদেশের জলবায়ুকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ নতুন নতুন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।