অধ্যায়–৮ বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য | বাংলাদেশ তথ্যকোষ (Bangladesh Encyclopedia)
অধ্যায়–৮
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য
ভূমিকা
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি মূলত নদীবাহিত পলিমাটি দ্বারা গঠিত। দীর্ঘকাল ধরে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী এবং তাদের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা হিমালয় অঞ্চল থেকে পলি বহন করে এনে বাংলাদেশের ভূমি তৈরি করেছে।
দেশের ভূপ্রকৃতিতে সমভূমি, পাহাড়, উপকূল, দ্বীপ, চর, হাওর, বিল ও বনাঞ্চলের বৈচিত্র্য দেখা যায়। এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের কৃষি, বসতি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির প্রধান বিভাগ
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়—
১. পাহাড়ি অঞ্চল
২. টেরেস বা উঁচু ভূমি অঞ্চল
৩. প্লাবন সমভূমি
৪. উপকূলীয় অঞ্চল
৫. নদী ও জলাভূমি অঞ্চল
১. পাহাড়ি অঞ্চল
বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশে পাহাড়ি অঞ্চল অবস্থিত।
প্রধান পাহাড়ি এলাকাগুলো—
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল
চট্টগ্রামের পূর্বাঞ্চল
সিলেটের টিলা অঞ্চল
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকা।
এর অন্তর্ভুক্ত—
রাঙামাটি
খাগড়াছড়ি
বান্দরবান
এই অঞ্চলে রয়েছে—
উঁচু-নিচু পাহাড়
ঝরনা
বনাঞ্চল
বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি
২. টেরেস বা উঁচু ভূমি অঞ্চল
বাংলাদেশের কিছু প্রাচীন ভূখণ্ড আশপাশের সমভূমি থেকে তুলনামূলক উঁচু।
প্রধান টেরেস অঞ্চল—
বরেন্দ্র অঞ্চল
অবস্থান—
রাজশাহী
নওগাঁ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
দিনাজপুরের কিছু অংশ
বৈশিষ্ট্য—
অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমি
লালচে মাটি
প্রাচীন পলল গঠন
মধুপুর ও ভাওয়াল গড়
অবস্থান—
ঢাকা
গাজীপুর
টাঙ্গাইলের কিছু অংশ
বৈশিষ্ট্য—
উঁচু ভূমি
শালবন
প্রাচীন ভূ-গঠন
৩. প্লাবন সমভূমি
বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল প্লাবন সমভূমি।
নদীর পানির সঙ্গে আসা পলি জমে এই ভূমি তৈরি হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য—
অত্যন্ত উর্বর মাটি
কৃষির জন্য উপযোগী
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা
নদী ও খালের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
প্রধান সমভূমি—
পদ্মা অববাহিকা
যমুনা অববাহিকা
মেঘনা অববাহিকা
৪. উপকূলীয় অঞ্চল
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন।
প্রধান উপকূলীয় এলাকাগুলো—
খুলনা
বরিশাল
পটুয়াখালী
বরগুনা
ভোলা
কক্সবাজার
চট্টগ্রাম
বৈশিষ্ট্য—
জোয়ার-ভাটা
চর সৃষ্টি
লবণাক্ত ভূমি
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য
ম্যানগ্রোভ বন
৫. দ্বীপ ও চর অঞ্চল
নদী ও সমুদ্রের প্রভাবে বাংলাদেশে অনেক দ্বীপ ও চর সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধান দ্বীপ—
ভোলা দ্বীপ
সন্দ্বীপ
হাতিয়া
মহেশখালী
কুতুবদিয়া
সেন্ট মার্টিন
চর অঞ্চল নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পলি জমার ফলে তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মৃত্তিকা
বাংলাদেশের মাটি মূলত পলিমাটির তৈরি। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন।
প্রধান মাটির ধরন—
পলিমাটি
নদী অববাহিকায় পাওয়া যায়।
কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
লাল মাটি
বরেন্দ্র ও মধুপুর অঞ্চলে দেখা যায়।
পাহাড়ি মাটি
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকায় পাওয়া যায়।
লবণাক্ত মাটি
উপকূলীয় এলাকায় পাওয়া যায়।
নদী ও জলাভূমি
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের ভূপ্রকৃতি নদীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
প্রধান জলাভূমি—
হাওর
বিল
বাওড়
জলাশয়
বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের হাওর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিলগুলো জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবন
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনগুলোর একটি।
অবস্থান—
খুলনা
সাতক্ষীরা
বাগেরহাট
বৈশিষ্ট্য—
ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ
রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল
প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে ভূমিকা
সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য
প্রাকৃতিক সম্পদ
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ—
প্রাকৃতিক গ্যাস
কয়লা
চুনাপাথর
বালি
মৎস্যসম্পদ
বনজ সম্পদ
কৃষিজ সম্পদ
ভূপ্রকৃতির অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এর মাধ্যমে—
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
নদীপথে যোগাযোগ হয়।
মৎস্যসম্পদ পাওয়া যায়।
পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
বনজ সম্পদ সংরক্ষিত হয়।
তথ্যছক
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রধান ভূপ্রকৃতি | সমভূমি |
| প্রধান পাহাড়ি এলাকা | পার্বত্য চট্টগ্রাম |
| প্রধান উঁচু ভূমি | বরেন্দ্র, মধুপুর গড় |
| প্রধান নদী অববাহিকা | পদ্মা, যমুনা, মেঘনা |
| প্রধান বন | সুন্দরবন |
| প্রধান জলাভূমি | হাওর, বিল, বাওড় |
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি নদী, পলি, পাহাড়, সমুদ্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সমন্বয়ে গঠিত। এই বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি দেশের কৃষি, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনধারাকে প্রভাবিত করেছে।
পরবর্তী অধ্যায়
অধ্যায়–৯ : বাংলাদেশের জলবায়ু — এতে বাংলাদেশের ঋতু, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মৌসুমি বায়ু, ঘূর্ণিঝড়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।