অধ্যায়–৬ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয় ও সংবিধান, বাংলাদেশ তথ্যকোষ (Bangladesh Encyclopedia)
অধ্যায়–৬
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয় ও সংবিধান
ভূমিকা
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো সংবিধান, যা দেশের সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, নাগরিকের অধিকার, সরকারের ক্ষমতা, আইন প্রণয়ন, বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা সংবিধানে নির্ধারিত হয়েছে।
রাষ্ট্রের পরিচয়
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| রাষ্ট্রের পূর্ণ নাম | গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ |
| ইংরেজি নাম | People's Republic of Bangladesh |
| রাষ্ট্রের প্রকৃতি | স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র |
| রাজধানী | ঢাকা |
| সরকারি ভাষা | বাংলা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| নাগরিক পরিচয় | বাংলাদেশের নাগরিক |
| রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন | বাংলাদেশের সংবিধান |
রাষ্ট্রের নামের অর্থ
"গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ" নামটি তিনটি শব্দ নিয়ে গঠিত।
গণ অর্থ জনগণ।
প্রজাতন্ত্রী অর্থ জনগণের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ।
বাংলাদেশ অর্থ বাঙালির দেশ বা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের স্বাধীন রাষ্ট্র।
সংবিধান কী?
সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। দেশের অন্য সব আইন সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। কোনো আইন সংবিধানের পরিপন্থী হলে তা আদালতের মাধ্যমে বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা করা যেতে পারে।
সংবিধান রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নির্ধারণ করে এবং নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাস
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করে।
সংবিধান গৃহীত হয় ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর।
এটি কার্যকর হয় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যা বাংলাদেশের প্রথম বিজয় দিবসের বার্ষিকী।
সংবিধানের উদ্দেশ্য
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—
- স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণ করা।
- জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
- গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
- আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
- রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা নির্ধারণ করা।
সংবিধানের বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহ—
- লিখিত সংবিধান
- সর্বোচ্চ আইন
- একক রাষ্ট্রব্যবস্থা
- সংসদীয় শাসনব্যবস্থা
- মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ
- স্বাধীন বিচার বিভাগ
- আইনের শাসনের স্বীকৃতি
- জনগণের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি
রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ। জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।
রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনটি প্রধান অঙ্গ রয়েছে।
আইন বিভাগ (Legislature)
আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান।
নির্বাহী বিভাগ (Executive)
রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন পরিচালনা এবং আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে।
বিচার বিভাগ (Judiciary)
আইনের ব্যাখ্যা প্রদান, বিচার কার্যক্রম পরিচালনা এবং সংবিধান রক্ষা করে।
নাগরিকত্ব
যিনি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক।
নাগরিকদের রয়েছে—
- আইনের দৃষ্টিতে সমান মর্যাদা
- মৌলিক অধিকার
- ভোটাধিকার (প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী)
- রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার
- আইন মেনে চলার দায়িত্ব
মৌলিক অধিকার
সংবিধানে নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার
- জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
- ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা
- চলাফেরার স্বাধীনতা
- পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা
- শিক্ষার সুযোগ
- আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার
এসব অধিকার সংবিধান ও প্রযোজ্য আইনের অধীনে সংরক্ষিত।
রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি
সংবিধানের প্রস্তাবনা ও সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা উল্লেখ রয়েছে। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা প্রদান করে এবং আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংবিধান সংশোধন
সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে। তবে সংশোধনের জন্য সংবিধানে নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধানের গুরুত্ব
সংবিধান—
- রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি।
- নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে।
- সরকারের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
- গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয় ও সংবিধান দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং আইনি কাঠামোর ভিত্তি। সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে জনগণের অধিকার, সরকারের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা নির্ধারণ করে। স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রণীত এই সংবিধান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
পরবর্তী অধ্যায়
অধ্যায়–৭ : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান — এতে বাংলাদেশের অবস্থান, সীমানা, আয়তন, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অক্ষাংশ–দ্রাঘিমাংশ, সময় অঞ্চল এবং কৌশলগত গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।