অধ্যায়–২২ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ ও আধুনিক বিশ্বের উত্থান
অধ্যায়–২২
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ ও আধুনিক বিশ্বের উত্থান
ভূমিকা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনের উত্থান বিশ্বকে আবারও এক ভয়াবহ যুদ্ধে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫) মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী সংঘর্ষ হিসেবে পরিচিত।
যুদ্ধের পর পৃথিবী দুটি প্রধান শক্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে—যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়কে বলা হয় স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War)। একই সময়ে মহাকাশ অভিযান, কম্পিউটার প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়নের সূচনা আধুনিক বিশ্বের রূপ গঠন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা
১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।
যুদ্ধে প্রধান দুটি জোট ছিল—
মিত্রশক্তি (Allies)
যুক্তরাজ্য
সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৪১ থেকে)
যুক্তরাষ্ট্র (১৯৪১ থেকে)
চীন
এবং অন্যান্য মিত্র দেশ
অক্ষশক্তি (Axis Powers)
জার্মানি
ইতালি
জাপান
যুদ্ধের বিস্তার
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে—
ইউরোপ
আফ্রিকা
এশিয়া
প্রশান্ত মহাসাগর
লক্ষ লক্ষ সৈন্য ও সাধারণ মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হলোকাস্ট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি পরিকল্পিতভাবে ইউরোপের ইহুদিদের গণহত্যা চালায়, যা হলোকাস্ট নামে পরিচিত।
এছাড়া রোমা জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং আরও অনেক মানুষ নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন।
হলোকাস্ট মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত।
পারমাণবিক বোমা
আগস্ট ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের—
হিরোশিমা
নাগাসাকি
শহরে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে।
এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে।
এর কিছুদিন পর জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা
যুদ্ধের পর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালে United Nations প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর প্রধান উদ্দেশ্য—
আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা
মানবাধিকার উন্নয়ন
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
উন্নয়ন কার্যক্রম
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ স্বাধীন রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য।
স্নায়ুযুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের দুই পরাশক্তি—
যুক্তরাষ্ট্র
সোভিয়েত ইউনিয়ন
রাজনৈতিক ও আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে।
যদিও তাদের মধ্যে সরাসরি বড় যুদ্ধ হয়নি, তবুও—
অস্ত্র প্রতিযোগিতা
গুপ্তচরবৃত্তি
প্রক্সি যুদ্ধ
মহাকাশ প্রতিযোগিতা
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে।
মহাকাশ প্রতিযোগিতা
স্নায়ুযুদ্ধের সময় মহাকাশ গবেষণায় দ্রুত অগ্রগতি ঘটে।
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—
১৯৫৭: সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক–১ উৎক্ষেপণ করে।
১৯৬১: Yuri Gagarin মহাকাশে যান।
১৯৬৯: Neil Armstrong চাঁদে প্রথম পদচিহ্ন রাখেন।
প্রযুক্তির বিপ্লব
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দ্রুত বিকাশ ঘটে—
কম্পিউটার
স্যাটেলাইট
ইন্টারনেটের প্রাথমিক প্রযুক্তি
মোবাইল যোগাযোগ
চিকিৎসাবিজ্ঞান
এই প্রযুক্তিগুলো আধুনিক জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
এর আগে ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়া ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিশ্বায়নের যুগ
স্নায়ুযুদ্ধের পর—
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।
ইন্টারনেট বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ঘটে।
বিশ্ব অর্থনীতি আরও পরস্পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
তথ্যবক্স
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: ১৯৩৯–১৯৪৫
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৫
প্রথম মানুষ মহাকাশে: ১৯৬১
চাঁদে প্রথম মানুষ: ১৯৬৯
স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি: ১৯৯১
আপনি কি জানেন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আনুমানিক ৭–৮.৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
ইন্টারনেটের প্রাথমিক প্রযুক্তির বিকাশ স্নায়ুযুদ্ধের সময় শুরু হলেও, পরে এটি বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হয়।
চাঁদে মানুষের পদার্পণ মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষগুলোর একটি। এর পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ব স্নায়ুযুদ্ধের যুগে প্রবেশ করে। মহাকাশ গবেষণা, কম্পিউটার প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের নতুন রূপ গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–২৩ : একবিংশ শতাব্দী — প্রযুক্তি, মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও ২০২৬ সালের পৃথিবী