মহাবিশ্বের সৃষ্টি - অধ্যায়–১৯ প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ — সাম্রাজ্যের পতন ও নতুন বিশ্বের সূচনা
অধ্যায়–১৯
প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ — সাম্রাজ্যের পতন ও নতুন বিশ্বের সূচনা
ভূমিকা
প্রাচীন বিশ্বের বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলোর শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়লে বিশ্ব নতুন এক যুগে প্রবেশ করে, যাকে সাধারণভাবে মধ্যযুগ (Middle Ages) বলা হয়। এই সময়ে অনেক পুরোনো সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, আবার নতুন নতুন রাজ্য, সাম্রাজ্য ও সভ্যতার উত্থান হয়।
এই যুগে ধর্ম, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির নতুন বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীকালে আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোমান সাম্রাজ্যের বিভক্তি
খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে রোমান সাম্রাজ্য দুটি অংশে বিভক্ত হয়—
পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য
পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য (পরবর্তীকালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিত)
এই বিভক্তির ফলে প্রশাসন পরিচালনা সহজ হলেও রাজনৈতিক দুর্বলতা বাড়তে থাকে।
পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন
খ্রিস্টাব্দ ৪৭৬ সালে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
পতনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল—
রাজনৈতিক অস্থিরতা
অর্থনৈতিক সংকট
অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই
সীমান্তে জার্মানিক গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ
এই ঘটনাকে ইউরোপীয় ইতিহাসে প্রাচীন যুগের সমাপ্তি এবং মধ্যযুগের সূচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য
পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য আরও প্রায় এক হাজার বছর টিকে ছিল।
এর রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল)।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবদান—
রোমান আইন সংরক্ষণ
গ্রিক জ্ঞানচর্চা
উন্নত স্থাপত্য
বাণিজ্যের বিকাশ
বিখ্যাত হায়া সোফিয়া এই সময়ে নির্মিত হয়।
ইসলামী সভ্যতার উত্থান
সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাবের পর দ্রুত একটি বৃহৎ সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
উমাইয়া ও পরে আব্বাসীয় খেলাফতের সময়—
জ্ঞানচর্চা
চিকিৎসাবিজ্ঞান
গণিত
জ্যোতির্বিজ্ঞান
দর্শন
সাহিত্য
অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করে।
বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) ছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র।
ইউরোপের মধ্যযুগ
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে বহু ছোট ছোট রাজ্যের উত্থান ঘটে।
এই সময়ের বৈশিষ্ট্য—
সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা (Feudalism)
দুর্গ নির্মাণ
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে শহর ও বাণিজ্যের পুনরুত্থান ঘটে।
ভাইকিংদের অভিযান
অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে উত্তর ইউরোপের ভাইকিংরা সমুদ্রপথে বহু অঞ্চলে অভিযান চালায়।
তারা—
বাণিজ্য করত
নতুন অঞ্চল আবিষ্কার করত
কখনো লুটপাটও করত
তাদের অভিযানের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়।
চীনের অগ্রগতি
মধ্যযুগে চীনে বিভিন্ন রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটায়।
এই সময়ে—
কাগজের ব্যবহার বিস্তৃত হয়
মুদ্রণ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে
কম্পাস উন্নত হয়
গানপাউডারের ব্যবহার শুরু হয়
এই আবিষ্কারগুলো পরবর্তীকালে বিশ্ব ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।
বাণিজ্যের প্রসার
এ সময়ে স্থল ও সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।
বাণিজ্যের প্রধান পণ্য ছিল—
রেশম
মসলা
সোনা
রূপা
বস্ত্র
মূল্যবান পাথর
বণিকদের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি, ভাষা ও প্রযুক্তিরও বিস্তার ঘটে।
শিক্ষা ও বিজ্ঞান
মধ্যযুগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞানচর্চা অব্যাহত ছিল।
বিশেষ করে—
বাগদাদ
কায়রো
কর্ডোভা
নালন্দা (পূর্ববর্তী সময় থেকে)
চীনের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো
বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা ও দর্শনের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তথ্যবক্স
পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন: খ্রিস্টাব্দ ৪৭৬
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব: ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত
আব্বাসীয় খেলাফতের সূচনা: খ্রিস্টাব্দ ৭৫০
মধ্যযুগে কাগজ, কম্পাস ও গানপাউডারের উন্নয়ন বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
আপনি কি জানেন?
মধ্যযুগকে একসময় ইউরোপে "অন্ধকার যুগ" বলা হলেও, বর্তমান ইতিহাসবিদরা এই শব্দটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেন, কারণ একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞান ও সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল।
বাগদাদের বায়তুল হিকমাহে গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় বহু গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়েছিল।
কনস্টান্টিনোপল ছিল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
প্রাচীন বিশ্বের সাম্রাজ্যগুলোর পতনের পর পৃথিবী মধ্যযুগে প্রবেশ করে। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পাশাপাশি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য টিকে থাকে এবং ইসলামী সভ্যতা, চীন ও ইউরোপে নতুন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক বিকাশ ঘটে। এই সময়ে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার বিস্তার পরবর্তী রেনেসাঁ এবং আধুনিক যুগের ভিত্তি স্থাপন করে।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–২০ : রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও নতুন বিশ্বের আবিষ্কার