অধ্যায়–৭ মহাদেশের সৃষ্টি ও পরিবর্তন
অধ্যায়–৭
মহাদেশের সৃষ্টি ও পরিবর্তন
ভূমিকা
আজকের পৃথিবীতে আমরা সাতটি মহাদেশ দেখতে পাই। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে মহাদেশগুলো সবসময় এমন ছিল না। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর ভূত্বক ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। মহাদেশগুলো কখনো একত্রিত হয়েছে, আবার কখনো ভেঙে দূরে সরে গেছে।
এই দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলেই আজকের পৃথিবীর মানচিত্র গড়ে উঠেছে।
পৃথিবীর ভূত্বক
পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের কঠিন স্তরকে ভূত্বক (Crust) বলা হয়।
এই ভূত্বক একটানা নয়; বরং এটি অনেকগুলো বিশাল টেকটোনিক প্লেট (Tectonic Plates)-এ বিভক্ত।
এই প্লেটগুলো পৃথিবীর ম্যান্টলের ওপর অত্যন্ত ধীর গতিতে চলাচল করে।
গড়ে প্রতি বছর এগুলো ২–১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত সরে যেতে পারে।
প্লেট টেকটোনিক তত্ত্ব
বর্তমানে ভূতত্ত্বে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো প্লেট টেকটোনিক তত্ত্ব।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী—
পৃথিবীর ভূত্বক বিভিন্ন প্লেটে বিভক্ত।
প্লেটগুলো একে অপরের দিকে এগিয়ে আসতে পারে।
দূরে সরে যেতে পারে।
অথবা একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যেতে পারে।
এই চলাচলের ফলেই সৃষ্টি হয়—
পর্বতমালা
ভূমিকম্প
আগ্নেয়গিরি
নতুন সমুদ্রতল
সুপারমহাদেশ
পৃথিবীর ইতিহাসে বহুবার সব মহাদেশ একত্রিত হয়ে একটি বিশাল ভূখণ্ড গঠন করেছে। এ ধরনের বিশাল ভূখণ্ডকে সুপারমহাদেশ (Supercontinent) বলা হয়।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, অতীতে বেশ কয়েকটি সুপারমহাদেশ ছিল।
সবচেয়ে পরিচিত সুপারমহাদেশ হলো প্যাঞ্জিয়া (Pangaea)।
প্যাঞ্জিয়ার সৃষ্টি
প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগ একত্রিত হয়ে প্যাঞ্জিয়া গঠন করে।
প্যাঞ্জিয়ার চারদিকে ছিল একটি বিশাল মহাসাগর, যার নাম প্যানথালাসা (Panthalassa)।
এই সময় পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাণী একই বিশাল স্থলভাগে বিচরণ করত।
প্যাঞ্জিয়ার বিভক্তি
প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন বছর আগে প্যাঞ্জিয়া ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে শুরু করে।
প্রথমে এটি দুটি বড় অংশে বিভক্ত হয়—
লরেশিয়া (Laurasia) — উত্তর অংশ
গন্ডোয়ানা (Gondwana) — দক্ষিণ অংশ
পরবর্তীকালে এগুলো আরও ভেঙে বর্তমান মহাদেশগুলোর জন্ম দেয়।
বর্তমান সাতটি মহাদেশ
আজ পৃথিবীতে সাধারণভাবে সাতটি মহাদেশ স্বীকৃত—
এশিয়া
আফ্রিকা
উত্তর আমেরিকা
দক্ষিণ আমেরিকা
ইউরোপ
অস্ট্রেলিয়া (ওশেনিয়ার প্রধান স্থলভাগ)
অ্যান্টার্কটিকা
কিছু অঞ্চলে ইউরোপ ও এশিয়াকে একত্রে ইউরেশিয়া হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
ভারতীয় প্লেটের যাত্রা
প্রায় ১২০ মিলিয়ন বছর আগে ভারতীয় প্লেট গন্ডোয়ানা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
প্রায় ৫০–৬০ মিলিয়ন বছর আগে এটি ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
এই সংঘর্ষের ফলেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় গঠিত হয়।
আজও ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যার কারণে হিমালয় প্রতি বছর অতি সামান্য উচ্চতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মহাসাগরের সৃষ্টি
মহাদেশগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন মহাসাগরের সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে পৃথিবীর পাঁচটি প্রধান মহাসাগর হলো—
প্রশান্ত মহাসাগর
আটলান্টিক মহাসাগর
ভারত মহাসাগর
দক্ষিণ মহাসাগর
উত্তর মেরু মহাসাগর
ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি
প্লেটগুলোর সংযোগস্থল পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চল।
এখানেই—
অধিকাংশ ভূমিকম্প ঘটে।
অধিকাংশ আগ্নেয়গিরি অবস্থিত।
নতুন পর্বত সৃষ্টি হয়।
বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় বলয় (Ring of Fire) পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলগুলোর একটি।
ভবিষ্যতের মহাদেশ
প্লেটগুলোর চলাচল এখনো থেমে যায়নি।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, আগামী ২০–৩০ কোটি বছর পরে বর্তমান মহাদেশগুলো আবারও একত্রিত হয়ে নতুন একটি সুপারমহাদেশ গঠন করতে পারে।
তবে এর সুনির্দিষ্ট রূপ সম্পর্কে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেলে ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস রয়েছে।
তথ্যবক্স
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাদেশ: এশিয়া
সবচেয়ে বড় মহাসাগর: প্রশান্ত মহাসাগর
সবচেয়ে দীর্ঘ পর্বতমালা (স্থলভাগে): অ্যান্ডিজ
সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ: মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮.৮৬ মিটার)
আপনি কি জানেন?
দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার উপকূলরেখা মানচিত্রে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অনেকাংশে খাপ খেয়ে যায়।
আটলান্টিক মহাসাগর প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার করে প্রশস্ত হচ্ছে।
পৃথিবীর ভূত্বক স্থির নয়; এটি সব সময় ধীর গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
পৃথিবীর মহাদেশগুলো স্থির নয়; টেকটোনিক প্লেটের ধীর গতির চলাচলের কারণে তারা কোটি কোটি বছর ধরে স্থান পরিবর্তন করে আসছে। অতীতে প্যাঞ্জিয়া নামে একটি সুপারমহাদেশ ছিল, যা ভেঙে বর্তমান সাতটি মহাদেশের জন্ম দেয়। একই প্রক্রিয়ায় পর্বতমালা, মহাসাগর, ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পৃথিবীর মানচিত্র পরিবর্তিত হতে থাকবে।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–৮ : ডাইনোসরের যুগ