অধ্যায়–২০ রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও নতুন বিশ্বের আবিষ্কার
অধ্যায়–২০
রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও নতুন বিশ্বের আবিষ্কার
ভূমিকা
মধ্যযুগের শেষ দিকে ইউরোপে জ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের এক নতুন জাগরণ শুরু হয়। এই যুগকে বলা হয় রেনেসাঁ (Renaissance), যার অর্থ "পুনর্জন্ম"। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান জ্ঞানচর্চার পুনরাবিষ্কার, মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং সমুদ্রপথে নতুন নতুন অঞ্চলের সন্ধান মানব ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
এই সময়েই আধুনিক বিজ্ঞান, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য এবং ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের ভিত্তি তৈরি হয়।
রেনেসাঁ কী?
রেনেসাঁ ছিল মূলত ১৪শ থেকে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে সংঘটিত এক সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন।
এর কেন্দ্র ছিল ইতালির বিভিন্ন নগর, বিশেষ করে ফ্লোরেন্স।
রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য—
শিল্পকলার বিকাশ
সাহিত্যচর্চা
মানবতাবাদ (Humanism)
বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের প্রতি আগ্রহ
প্রাচীন জ্ঞানের পুনরুদ্ধার
শিল্পকলার নবজাগরণ
এই সময়ে বহু বিখ্যাত শিল্পীর আবির্ভাব ঘটে।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
Leonardo da Vinci
Michelangelo
Raphael
তাদের চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও স্থাপত্য আজও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার
প্রায় ১৪৫০ সালের দিকে Johannes Gutenberg ইউরোপে চলন্ত অক্ষরের মুদ্রণযন্ত্র উন্নত করেন।
এর ফলে—
বই দ্রুত ছাপা সম্ভব হয়।
জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
শিক্ষা বিস্তার লাভ করে।
বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রসার ঘটে।
সমুদ্রপথে নতুন বিশ্বের সন্ধান
১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় নাবিকরা নতুন সমুদ্রপথ অনুসন্ধান শুরু করেন।
উল্লেখযোগ্য অভিযান—
Christopher Columbus ১৪৯২ সালে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছান (যদিও তিনি মনে করেছিলেন তিনি এশিয়ায় পৌঁছেছেন)।
Vasco da Gama ১৪৯৮ সালে সমুদ্রপথে ভারতে পৌঁছান।
Ferdinand Magellan-এর অভিযাত্রা প্রথম সফল বিশ্বপরিক্রমার পথ উন্মুক্ত করে (অভিযানটি তাঁর মৃত্যুর পর সম্পন্ন হয়)।
বৈজ্ঞানিক বিপ্লব
১৬শ ও ১৭শ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার নতুন পদ্ধতি গড়ে তোলেন।
এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন—
Nicolaus Copernicus
Galileo Galilei
Johannes Kepler
Isaac Newton
তাদের গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা প্রচলিত ছিল।
কোপার্নিকাস প্রস্তাব করেন যে—
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।
অন্যান্য গ্রহও সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
পরবর্তীকালে গ্যালিলিও ও কেপলার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গণনার মাধ্যমে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেন।
উপনিবেশ স্থাপনের সূচনা
নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কারের পর ইউরোপীয় শক্তিগুলো—
আমেরিকা
আফ্রিকা
এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে
বাণিজ্যকেন্দ্র ও উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে।
এর ফলে—
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।
নতুন ফসল ও পণ্যের আদান-প্রদান ঘটে।
একই সঙ্গে বহু অঞ্চলে শোষণ, দাসব্যবসা এবং সংঘাতও বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন
এই সময়ে—
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দ্রুত বিস্তৃত হয়।
নতুন সমুদ্রবন্দর গড়ে ওঠে।
ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
তথ্যবক্স
রেনেসাঁ: প্রায় ১৪শ–১৬শ শতাব্দী
গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র: প্রায় ১৪৫০
কলম্বাসের অভিযান: ১৪৯২
ভাস্কো দা গামার ভারতে আগমন: ১৪৯৮
বৈজ্ঞানিক বিপ্লব: ১৬শ–১৭শ শতাব্দী
আপনি কি জানেন?
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না; তিনি প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকও ছিলেন।
গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র জ্ঞান বিস্তারে বিপ্লব ঘটায়।
বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের পর পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষাভিত্তিক গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
রেনেসাঁ ইউরোপে জ্ঞান, শিল্প ও মানবতাবাদের নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার শিক্ষা ও জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। সমুদ্রপথে নতুন বিশ্বের সন্ধান বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তারের সূচনা করে। একই সময়ে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–২১ : শিল্পবিপ্লব, আধুনিক রাষ্ট্র ও বিশ্বযুদ্ধের পথে