অধ্যায়–৯ ডাইনোসরের বিলুপ্তি
অধ্যায়–৯
ডাইনোসরের বিলুপ্তি
ভূমিকা
ডাইনোসররা পৃথিবীতে প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন বছর ধরে আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এক ভয়াবহ ঘটনা তাদের অধিকাংশকে বিলুপ্ত করে দেয়। এই ঘটনাটি শুধু ডাইনোসরদেরই নয়, পৃথিবীর অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভাগ্যও বদলে দেয়।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে সংঘটিত একটি মহাজাগতিক বিপর্যয় ছিল এই গণবিলুপ্তির প্রধান কারণ। তবে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, একই সময়ে অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনাও এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল।
গণবিলুপ্তি কী?
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কয়েকটি সময় এসেছে যখন অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই ঘটনাকে গণবিলুপ্তি (Mass Extinction) বলা হয়।
এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ইতিহাসে পাঁচটি প্রধান গণবিলুপ্তির কথা উল্লেখ করেছেন।
ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ছিল ক্রিটেশিয়াস–প্যালিওজিন (K–Pg) গণবিলুপ্তি, যা প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে ঘটে।
গ্রহাণুর আঘাত
বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রায় ১০–১৫ কিলোমিটার ব্যাসের একটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানে।
এই আঘাতের স্থান বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপ, যেখানে আজও চিকশুলুব (Chicxulub) গহ্বর বিদ্যমান।
সংঘর্ষের শক্তি ছিল কোটি কোটি পারমাণবিক বোমার সম্মিলিত শক্তির সমতুল্য।
সংঘর্ষের তাৎক্ষণিক প্রভাব
গ্রহাণুর আঘাতের ফলে—
বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে।
হাজার হাজার কিলোমিটার এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে।
প্রবল ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
শত শত মিটার উঁচু সুনামি তৈরি হয়।
বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা ও গলিত শিলা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনাগুলো পৃথিবীর পরিবেশকে দ্রুত পরিবর্তন করে দেয়।
সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হওয়া
বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা ও ছাই ছড়িয়ে পড়ায় সূর্যের আলো দীর্ঘ সময়ের জন্য পৃথিবীর পৃষ্ঠে কম পৌঁছাতে থাকে।
ফলে—
তাপমাত্রা কমে যায়।
সালোকসংশ্লেষণ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
উদ্ভিদ মারা যেতে শুরু করে।
উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীরাও খাদ্য সংকটে পড়ে।
খাদ্যশৃঙ্খলের পতন
প্রথমে উদ্ভিদ ধ্বংস হয়।
এরপর—
তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়।
তাদের ওপর নির্ভরশীল মাংসাশী প্রাণীরাও বিলুপ্ত হতে শুরু করে।
অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর বহু স্থল ও সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে।
আগ্নেয়গিরির ভূমিকা
একই সময়ে বর্তমান ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে ডেকান ট্র্যাপস (Deccan Traps) অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটছিল।
এতে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্যাস নির্গত হয়।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো আলোচনা রয়েছে—
গ্রহাণুর আঘাতই কি প্রধান কারণ ছিল?
নাকি গ্রহাণুর আঘাত এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ একসঙ্গে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে পরিবর্তন করেছিল?
বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে অধিকাংশ গবেষক গ্রহাণুর আঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন, আর আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপকে সম্ভাব্য সহায়ক কারণ হিসেবে দেখেন।
কোন প্রাণীরা টিকে ছিল?
সব প্রাণী বিলুপ্ত হয়নি।
যেসব প্রাণী টিকে থাকতে পেরেছিল, তাদের মধ্যে ছিল—
কিছু ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী
কচ্ছপ
কুমির
কিছু উভচর প্রাণী
বিভিন্ন ধরনের মাছ
পাখির পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত আধুনিক পাখির বংশধারা
এই প্রাণীগুলো পরবর্তীকালে নতুন পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে বিস্তার লাভ করে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীর উত্থান
ডাইনোসরদের বিলুপ্তির পর পৃথিবীতে বিশাল পরিবেশগত শূন্যতা তৈরি হয়।
এই সুযোগে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা দ্রুত বিবর্তিত হতে শুরু করে।
পরবর্তী কয়েক কোটি বছরে—
প্রাইমেট
তৃণভোজী স্তন্যপায়ী
শিকারি স্তন্যপায়ী
এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের পূর্বপুরুষের উদ্ভবের পথ তৈরি হয়।
তথ্যবক্স
গণবিলুপ্তির সময়: প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে
সম্ভাব্য গ্রহাণুর ব্যাস: ১০–১৫ কিলোমিটার
সংঘর্ষস্থল: বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপ
পৃথিবীর প্রজাতির আনুমানিক ৭৫% এই গণবিলুপ্তিতে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আপনি কি জানেন?
চিকশুলুব গহ্বরের ব্যাস প্রায় ১৮০ কিলোমিটার।
আধুনিক পাখিদের অনেক বিজ্ঞানী ডাইনোসরের জীবিত উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করেন।
ডাইনোসরদের বিলুপ্তি না ঘটলে স্তন্যপায়ী প্রাণী, এমনকি মানুষের বিবর্তনও ভিন্ন পথে ঘটতে পারত—তবে এটি একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, নিশ্চিত ইতিহাস নয়।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে একটি বৃহৎ গ্রহাণুর পৃথিবীতে আঘাত এবং সম্ভাব্যভাবে সমসাময়িক আগ্নেয়গিরির তীব্র কার্যকলাপ পৃথিবীর পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। এর ফলে ক্রিটেশিয়াস–প্যালিওজিন গণবিলুপ্তি সংঘটিত হয়, যেখানে পৃথিবীর প্রায় ৭৫% প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ডাইনোসরদের অধিকাংশ বিলুপ্ত হলেও কিছু প্রাণী টিকে থাকে এবং পরবর্তীকালে স্তন্যপায়ী প্রাণীর দ্রুত বিকাশের মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–১০ : স্তন্যপায়ী প্রাণীর উত্থান