অধ্যায়–১৩ নিয়ান্ডারথাল, ডেনিসোভান ও আধুনিক মানুষের আবির্ভাব
অধ্যায়–১৩
নিয়ান্ডারথাল, ডেনিসোভান ও আধুনিক মানুষের আবির্ভাব
ভূমিকা
মানব বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে পৃথিবীতে একই সময়ে একাধিক মানবপ্রজাতি বসবাস করত। আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) একমাত্র মানবপ্রজাতি ছিল না। তাদের পাশাপাশি নিয়ান্ডারথাল (Neanderthal), ডেনিসোভান (Denisovan) এবং আরও কয়েকটি মানবগোষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করত।
বর্তমান জিনতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব ও জীবাশ্মবিদ্যার গবেষণায় জানা যায়, এই মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, অভিবাসন এবং কিছু ক্ষেত্রে আন্তঃপ্রজননও ঘটেছিল।
নিয়ান্ডারথাল কারা?
নিয়ান্ডারথাল (Homo neanderthalensis) ছিল মানুষের নিকটতম বিলুপ্ত আত্মীয়দের একটি।
তারা প্রধানত—
ইউরোপ
পশ্চিম এশিয়া
মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে
প্রায় ৪,০০,০০০ বছর আগে থেকে ৪০,০০০ বছর আগে পর্যন্ত বসবাস করেছিল।
নিয়ান্ডারথালদের বৈশিষ্ট্য
তাদের শারীরিক গঠন আধুনিক মানুষের তুলনায় ছিল—
অধিক শক্তিশালী
খাটো কিন্তু পেশিবহুল
প্রশস্ত বুক
বড় নাক
তুলনামূলকভাবে বড় মস্তিষ্ক
তারা বরফযুগের শীতল পরিবেশে অভিযোজিত ছিল।
নিয়ান্ডারথালদের জীবনযাপন
বর্তমান গবেষণা থেকে জানা যায়, তারা—
দক্ষ শিকারি ছিল।
আগুন ব্যবহার করত।
পশুর চামড়া দিয়ে শরীর ঢাকত।
পাথরের উন্নত সরঞ্জাম তৈরি করত।
আহত ও অসুস্থ সদস্যদের যত্ন নিত।
কিছু ক্ষেত্রে মৃতদের সমাহিত করত।
এসব আচরণ তাদের সামাজিক ও মানসিক সক্ষমতার পরিচয় দেয়।
ডেনিসোভান কারা?
ডেনিসোভানরা ছিল আরেকটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠী।
২০১০ সালে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহা থেকে আবিষ্কৃত একটি আঙুলের হাড় ও দাঁতের ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তাদের সম্পর্কে জানতে পারেন।
আজও ডেনিসোভানদের সম্পূর্ণ কঙ্কাল পাওয়া যায়নি, তাই তাদের শারীরিক চেহারা সম্পর্কে অনেক তথ্য এখনো গবেষণাধীন।
আধুনিক মানুষের আবির্ভাব
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, হোমো সেপিয়েন্স (Homo sapiens)-এর আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায়।
তাদের বৈশিষ্ট্য ছিল—
অপেক্ষাকৃত গোলাকার করোটি
উঁচু কপাল
স্পষ্ট চিবুক
উন্নত ভাষাগত ও জ্ঞানীয় ক্ষমতা
জটিল সামাজিক সংগঠন
এই বৈশিষ্ট্যগুলো আধুনিক মানুষকে অন্যান্য মানবপ্রজাতি থেকে আলাদা করে।
আফ্রিকা থেকে বিশ্বের পথে
প্রায় ৭০,০০০–৬০,০০০ বছর আগে, আধুনিক মানুষের কিছু গোষ্ঠী আফ্রিকা ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
তারা ধীরে ধীরে পৌঁছে—
এশিয়া
ইউরোপ
অস্ট্রেলিয়া
উত্তর আমেরিকা
দক্ষিণ আমেরিকা
এই দীর্ঘ অভিবাসন সম্পন্ন হতে হাজার হাজার বছর সময় লাগে।
মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সম্পর্ক
জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে—
আফ্রিকার বাইরে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের জিনে অল্প পরিমাণ নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ রয়েছে।
ওশেনিয়া ও এশিয়ার কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেনিসোভান ডিএনএও পাওয়া যায়।
এ থেকে বোঝা যায়, আধুনিক মানুষ ও এই মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে আন্তঃপ্রজনন ঘটেছিল।
নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তি
প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তাদের বিলুপ্তির কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জলবায়ুর পরিবর্তন
খাদ্যসংকট
আধুনিক মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
ছোট জনসংখ্যা
একাধিক কারণের সম্মিলিত প্রভাব
এ বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ
আধুনিক মানুষের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতীকী চিন্তা।
তারা—
গুহাচিত্র আঁকত।
অলংকার তৈরি করত।
বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করত।
ধর্মীয় বা আচারগত কর্মকাণ্ডে অংশ নিত বলে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ইঙ্গিত করে।
এই সাংস্কৃতিক বিকাশ মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ ভিত্তি তৈরি করে।
তথ্যবক্স
আধুনিক মানুষের আবির্ভাব: প্রায় ৩,০০,০০০ বছর আগে
নিয়ান্ডারথালের বিলুপ্তি: প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে
আফ্রিকা থেকে বড় অভিবাসন: প্রায় ৭০,০০০–৬০,০০০ বছর আগে
বর্তমান মানবপ্রজাতি: Homo sapiens
আপনি কি জানেন?
বর্তমান পৃথিবীর সব মানুষ একই প্রজাতির—Homo sapiens।
আফ্রিকার বাইরে অধিকাংশ মানুষের শরীরে নিয়ান্ডারথালের ডিএনএর ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে।
ডেনিসোভানদের সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশ তথ্য জীবাশ্মের চেয়ে ডিএনএ গবেষণা থেকে এসেছে।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
মানব বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে পৃথিবীতে একাধিক মানবপ্রজাতি সহাবস্থান করেছিল। নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভান ছিল আধুনিক মানুষের নিকটতম আত্মীয়দের মধ্যে অন্যতম। প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটে এবং পরবর্তীকালে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। জিনগত গবেষণা প্রমাণ করে যে এই মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সীমিত আন্তঃপ্রজনন ঘটেছিল। শেষ পর্যন্ত Homo sapiens-ই একমাত্র টিকে থাকা মানবপ্রজাতি হিসেবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–১৪ : প্রস্তর যুগ ও মানবসভ্যতার সূচনা