অধ্যায়–৫ পৃথিবীর প্রথম বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর
অধ্যায়–৫
পৃথিবীর প্রথম বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর
ভূমিকা
পৃথিবীর জন্মের পর এটি ছিল একটি অগ্নিগর্ভ ও গলিত শিলায় আচ্ছাদিত গ্রহ। তখনকার পৃথিবীতে মানুষের শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস ছিল না, ছিল না নদী, সাগর বা মহাসাগর। কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগরের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাগুলোই পরবর্তীকালে পৃথিবীতে জীবনের বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে।
প্রথম বায়ুমণ্ডল
পৃথিবীর জন্মের পর প্রথম যে বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়েছিল, তা খুবই অস্থায়ী ছিল। এটি মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে গঠিত হলেও পৃথিবীর দুর্বল মহাকর্ষ এবং সূর্যের তীব্র সৌরবায়ুর কারণে এই গ্যাসগুলো মহাকাশে হারিয়ে যায়।
ফলে পৃথিবী আবার প্রায় বায়ুশূন্য অবস্থায় পৌঁছে।
দ্বিতীয় বায়ুমণ্ডলের সৃষ্টি
পরবর্তীকালে পৃথিবীর অভ্যন্তরের প্রচণ্ড তাপ ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস নির্গত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে আউটগ্যাসিং (Outgassing) বলা হয়।
এই গ্যাসগুলোর মধ্যে ছিল—
জলীয় বাষ্প
কার্বন ডাই-অক্সাইড
নাইট্রোজেন
সালফার ডাই-অক্সাইড
মিথেন
অ্যামোনিয়া
এই গ্যাসগুলো মিলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বায়ুমণ্ডল তৈরি করে।
পৃথিবীর শীতল হওয়া
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। জলীয় বাষ্প ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রায় অবিরাম বৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃষ্টির পানি পৃথিবীর নিচু স্থানে জমা হয়ে প্রথম সমুদ্র ও মহাসাগরের জন্ম দেয়।
মহাসাগরের উৎপত্তি
বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবীর পানির প্রধান উৎস ছিল—
আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প।
বরফসমৃদ্ধ ধূমকেতু ও জলসমৃদ্ধ গ্রহাণুর আঘাতে আগত অতিরিক্ত পানি।
সম্ভবত এই দুই উৎসই পৃথিবীর বর্তমান জলভাণ্ডার গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
প্রথম মহাসাগর
প্রথম মহাসাগরের পানি আজকের মতো স্বচ্ছ ছিল না।
এর বৈশিষ্ট্য ছিল—
অত্যন্ত উষ্ণ
খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ
আগ্নেয় কার্যকলাপের প্রভাবযুক্ত
অক্সিজেনবিহীন
এই পরিবেশই পরবর্তীকালে পৃথিবীর প্রথম জীবের বিকাশের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে।
বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের অনুপস্থিতি
প্রথম দিকের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেন কার্যত ছিল না।
তাই—
মানুষ বা প্রাণীর মতো জটিল জীব বেঁচে থাকতে পারত না।
ওজোন স্তরও তখনো গঠিত হয়নি।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাত।
অক্সিজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল তৈরি হতে আরও শত কোটি বছর সময় লাগে।
নাইট্রোজেনের আধিপত্য
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি বড় অংশ সমুদ্রে দ্রবীভূত হয় এবং শিলার সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আবদ্ধ হয়ে যায়।
ফলে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
বর্তমান পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও নাইট্রোজেনই সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৭৮%।
পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র
পৃথিবীর গলিত বহিঃকেন্দ্রে লোহা ও নিকেলের প্রবাহের ফলে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এই চৌম্বক ক্ষেত্র—
সূর্যের ক্ষতিকর আধানযুক্ত কণার বড় অংশ প্রতিহত করে।
বায়ুমণ্ডলকে মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।
পৃথিবীতে জীবনের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জীবনের জন্য প্রস্তুত পৃথিবী
প্রথম কয়েকশো মিলিয়ন বছরের মধ্যে পৃথিবীতে ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে—
তরল পানি ছিল।
স্থিতিশীল ভূত্বক গড়ে ওঠে।
রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এই পরিবেশ থেকেই পৃথিবীতে প্রথম জীবনের সূচনা ঘটে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
তথ্যবক্স
পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% অংশ বর্তমানে পানি দ্বারা আচ্ছাদিত।
বর্তমান বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন প্রায় ৭৮% এবং অক্সিজেন প্রায় ২১%।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মহাসাগরগুলোর উৎপত্তি আনুমানিক ৪.৪–৪.০ বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
পৃথিবীর প্রথম বায়ুমণ্ডল স্থায়ী ছিল না। পরবর্তীকালে আগ্নেয়গিরির গ্যাস নির্গমনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়। পৃথিবী শীতল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হয় এবং প্রথম মহাসাগরের সৃষ্টি হয়। তখনো বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছিল না, তবে ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি হয় যা পৃথিবীতে জীবনের উদ্ভবের ভিত্তি স্থাপন করে।
পরবর্তী অধ্যায়:
অধ্যায়–৬ : প্রথম প্রাণের আবির্ভাব